আকাশছোঁয়া জীবনযাত্রার খরচ, নাগালের বাইরে বাড়িভাড়া এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—ইতালির তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে। সেই অসন্তোষের জবাবে প্রধানমন্ত্রী জর্জা মেলোনির সরকার আরও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু করেছে। বিক্ষোভ দমনে পুলিশের ক্ষমতা বাড়ানো থেকে শুরু করে সন্তানের ভাঙচুরের দায়ে বাবা-মাকে জরিমানা—বাদ যাচ্ছে না কিছুই।

মিলানের প্রাণকেন্দ্রে, বিখ্যাত ক্যাথিড্রাল-সংলগ্ন পিয়াৎসা দেল দুয়োমো চত্বরে এক কিশোরকে লাথি ও লাঠি মারতে মারতে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল দাঙ্গা পুলিশ। সেই দৃশ্যের ভিডিয়ো তুলছিলেন সাংবাদিক মার্তিনা মিক্কিকে। আচমকাই উড়ে আসা একটি বস্তু তাঁর মুখে এসে লাগে। ডান চোখের পাশে গভীর ক্ষত তৈরি হয়, পড়ে কালশিটেও।

গত শনিবার বিকেলে উত্তর ইতালির এই শহরে কয়েকশো বিক্ষোভকারীর সঙ্গে মিছিলে ছিলেন মিক্কিকে। তাঁদের অধিকাংশই তরুণ। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং নাগালের বাইরে চলে যাওয়া আবাসনের খরচের প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিলেন তাঁরা। অর্থনৈতিক দুর্দশা ঘিরে ইউরোপজুড়ে যে অসন্তোষ প্রতিবাদে রূপ নিচ্ছে, মিলানের মিছিল ছিল তারই প্রতিধ্বনি।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জর্জা মেলোনির চার বছরের শাসনে ইতালির তরুণেরা এই প্রথম সরব হলেন, এমন নয়। নিরাপত্তার অজুহাতে এবং প্রকাশ্য প্রতিবাদ নিয়ন্ত্রণে তাঁর শাসক জোটের ক্রমশ কঠোর হয়ে ওঠা ব্যবস্থার মুখে পড়ার ঝুঁকি নিয়েও তাঁরা বারবার ক্ষোভ জানিয়েছেন। আগামী শনিবার বিকেলেও মিলান-সহ ইতালির অন্য বড় শহরগুলিতে ফের বিক্ষোভের পরিকল্পনা রয়েছে।

মিক্কিকের কথায়, গত শনিবার বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত পরিস্থিতি শান্তই ছিল। তার পরে পুলিশ ভিয়া ব্রোলেত্তোয় প্রবেশের পথ আটকে দেয়। পিয়াৎসা দেল দুয়োমো থেকে হেঁটে ওই রাস্তায় পৌঁছতে মিনিট দশেক লাগে।

“মানুষ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন, কারণ তাঁদের দমন করা হচ্ছিল,” বলেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, ঢাল দিয়ে বিক্ষোভকারীদের পিছনে ঠেলে দেওয়ার সময় পুলিশ “হঠাৎ হিংস্র হয়ে ওঠে”। তাঁর কথায়, “হিংসা বাড়তে থাকে। ওরা নির্বিচারে লোকজনকে ধরে মারতে, লাথি দিতে শুরু করে। দৃশ্যটা ছিল ভয়াবহ।”

সংঘর্ষের মধ্যেই হতবাক পর্যটকদের চোখের সামনে গোটা চত্বর কাঁদানে গ্যাসে ভরিয়ে দেয় পুলিশ। এদিকে, বিক্ষোভের প্রান্তে থাকা একদল মুখোশধারী তরুণ আশপাশের নামী পোশাক ও বিলাসপণ্যের দোকানগুলির দিকে এগিয়ে যায়। রাস্তার নির্দেশক ফলক উপড়ে ফেলা, আবর্জনার পাত্রে আগুন ধরানো এবং দোকানের কাচ ভাঙার পর শুরু হয় লুটপাট। আক্রান্ত দোকানগুলির মধ্যে ছিল ফুট লকার ও লিভাইস।

রবিবারও থামেনি ভাঙচুর। মূলত শহরের উপকণ্ঠের প্রান্তিক এলাকা থেকে দল বেঁধে তরুণেরা ফের শহরের কেন্দ্রে জড়ো হয়। সামাজিক মাধ্যমের বিভিন্ন চ্যাটগোষ্ঠীতে বিলাসপণ্য হাতে পাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে তাদের অনেককে সেখানে টেনে আনা হয়েছিল।

দু’দিনের অশান্তিতে ২৭১ জনেরও বেশি তরুণ-তরুণীকে আটক করে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে ৩২ জনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে ২৩ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং ১৩ জন বিদেশি নাগরিক।

প্রতিবাদের জবাব আরও কড়াকড়ি

ইতালির সংবাদমাধ্যমে আহত পুলিশকর্মীদের ছবি প্রকাশিত হওয়ার পর দ্রুত আরও কিছু ব্যবস্থা কার্যকর করে মেলোনি সরকার। নতুন পদক্ষেপগুলির নিশানায় মূলত অপ্রাপ্তবয়স্কেরা। পাশাপাশি বাড়ানো হয়েছে পুলিশের ক্ষমতাও। সন্তানের ভাঙচুর ও লুটপাটের জন্য বাবা-মাকে আর্থিকভাবে দায়ী করার ব্যবস্থাও রয়েছে। মিলানে মোতায়েন করা হয়েছে ৫০০ সেনা।

নতুন আইন অনুযায়ী, বিক্ষোভে হিংসাত্মক কার্যকলাপে অংশ নেওয়া অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। দাঙ্গায় জড়িতদের জন্য আরও কঠোর শাস্তির ব্যবস্থাও করা হয়েছে।

সরকারের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কিছু পদক্ষেপ এবার দক্ষিণ ইতালিতেও প্রয়োগ করা হচ্ছে। সেখানে জ্বালানির চড়া দামের প্রতিবাদে এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে আন্দোলন করছেন ট্রাকচালকেরা। তাঁদের রাস্তা অবরোধের জেরে সুপারমার্কেটগুলিতে পণ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। অবরোধের ঘটনায় ৭১ জনের বিরুদ্ধে বিচারবিভাগীয় কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ জানানো হয়েছে এবং ২৪২ জনকে জরিমানা করা হয়েছে।

আগের একটি নিরাপত্তা আইনে প্রতিবাদের এই পদ্ধতিকে বেআইনি করা হয়েছিল। এক সরকারি আধিকারিক ট্রাকচালকদের সতর্ক করে জানিয়েছেন, জনসাধারণের চলাচলের রাস্তা আটকে দিলে কারাদণ্ডও হতে পারে।

চোখের পাশের ক্ষতে সেলাই করাতে হয়েছে মিক্কিকেকে। তাঁর অভিযোগ, “এই সরকার বিক্ষোভকারীদের কথা শোনা এবং সমস্যাগুলির সমাধান করার বদলে শুধু তাঁদের দমন করার চেষ্টা করে। সব কিছুর মধ্যে যোগ রয়েছে। দক্ষিণে জ্বালানির দাম নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে, আর সর্বত্র তরুণেরা ক্ষুব্ধ। ভবিষ্যতের কথা ভাবার সুযোগটুকুও তাদের নেই, কারণ বর্তমান নিয়েই তারা এতটা আতঙ্কিত।”

চৌত্রিশ বছরের এই সাংবাদিক আরও বলেন, “আমরা নিরাপদও বোধ করছি না। কারণ আমরা দেখতে পাচ্ছি, পুলিশ এখন কতটা ছাড় পাচ্ছে এবং তাদের কতটা আড়াল করে রাখা হচ্ছে।” তাঁর অভিযোগ, মিলানে, বিশেষ করে শহরের কেন্দ্রস্থলে এবং রেলস্টেশনগুলির আশপাশে, জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে সন্দেহ করা ও তল্লাশি চালানো এখন প্রায় স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তুরিন ও বোলোনিয়ার বিক্ষোভ-সহ সপ্তাহান্তের এই অশান্তি ইতালির ‘হারিয়ে যাওয়া প্রজন্ম’ নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র করেছে।

একদিকে তরুণদের বিক্ষোভ, অন্যদিকে তার প্রান্তে ঘটে যাওয়া হিংসা—দু’টিই সামনে এনেছে ইতালির সমাজের গভীর বিভাজন। একদিকে প্রান্তিক ও অভিবাসী তরুণসমাজ, অন্যদিকে তুলনায় বেশি সুযোগ ও সম্ভাবনা নিয়ে বেড়ে ওঠা তরুণেরা।

শ্রমজীবী ইতালীয় পরিবারের সন্তান কিংবা অভিবাসী পরিবারের দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের তরুণদের দক্ষিণপন্থী রাজনীতিক ও সংবাদমাধ্যম প্রায়ই ‘মারান্‌ৎসা’ বলে চিহ্নিত করে। শহরের কেন্দ্রে দল বেঁধে সময় কাটানো তরুণদের বোঝাতে শব্দটি অবজ্ঞাসূচক অর্থে ব্যবহৃত হয়।

এই তরুণদের অনেকেই আসে বারোনার মতো এলাকা থেকে। মিলানের দক্ষিণ-পশ্চিমে বিস্তীর্ণ সরকারি আবাসন এলাকা বারোনা। গত সপ্তাহান্তের ঘটনাগুলি নিয়ে সেখানকার তরুণদের মধ্যেও চলছে আলোচনা।

দোমেনিকো রিচ্চি বলেন, “চারদিকে প্রবল অসন্তোষ। আমরা সকলেই এই সর্বব্যাপী দুরবস্থার সন্তান।” লুকা ওর্লান্দোর সঙ্গে তিনি একটি পানশালা পরিচালনা করেন। সেটি ‘বারিয়োস’ নামে একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের অংশ, যেখানে এলাকার তরুণেরা একত্র হন।

ওর্লান্দোর মতে, ভাঙচুর ও লুটপাটের মধ্যে প্রকাশ পেয়েছে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ। বছরের পর বছর কেউ তাদের কথা শোনেনি, কেউ তাদের অস্তিত্বকে গুরুত্ব দেয়নি।

তিনি বলেন, “তাই সুযোগ এলেই এই ছেলেমেয়েরা প্রতিশোধ নেয়। নিছক কিছু চুরি করতে চায় বলেই তারা এমন করে না। এই সরকার শুধু নতুন নতুন অপরাধের সংজ্ঞা তৈরি করে যায়। কখনও শোনে না, কখনও আলোচনায় বসে না।”

ওর্লান্দোর বাবা-মা এসেছিলেন কালাব্রিয়া থেকে। দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া অসন্তোষ তিনি নিজের চোখে দেখছেন। তাঁর কথায়, “কিন্তু ওখানকার [দক্ষিণ-পশ্চিমের] বিক্ষোভ সংবাদমাধ্যমে প্রায় জায়গাই পায়নি। আর আমরা মিলান নিয়ে কথা বলছি শুধু হিংসার কারণে, আসল সমস্যাগুলির জন্য নয়।”

আঠারো বছরের টমাস বারোনাতেই বড় হয়েছে। রান্নার পেশায় প্রশিক্ষণ নিচ্ছে সে। কিন্তু যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ইতালি ছাড়তে চায়। তার কথায়, “এখানে আমার কোনও ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছি না।”

তার বন্ধু মহম্মদ মরক্কোর বংশোদ্ভূত ইতালীয় নাগরিক। এখনও স্কুলে পড়ে সে, ভবিষ্যতে আইনজীবী হতে চায়। তার বক্তব্য, “ভুল করলে তার দায় নিতেই হবে। কিন্তু প্রতিবাদের একটা বৈশিষ্ট্যও আছে—সরকার যত বেশি মানুষের কথা শুনতে অস্বীকার করে, মানুষ তত বেশি ক্ষুব্ধ হয়।”

মিলানের ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব দ্য স্যাক্রেড হার্টের সমাজতত্ত্ববিদ মাউরো মাগাত্তির মতে, আর্থসামাজিক দুরবস্থা এবং পরিত্যক্ত হওয়ার অনুভূতি “গোটা একটি প্রজন্মকে” গ্রাস করেছে। এই ক্ষোভের জবাবে অতিরিক্ত দমনপীড়ন চালালে প্রতিবাদ আরও ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।

তিনি বলেন, “হিংসার নিন্দা সব সময়ই করতে হবে। কিন্তু ক্ষোভ ও হিংসার এই বিস্ফোরণ কাটিয়ে উঠতে এখন উত্তেজনা কমানো প্রয়োজন। মন দিতে হবে প্রকৃত সমস্যাগুলির সমাধানে।”

ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা

শনিবারের বিক্ষোভের আগে গত কয়েক দিনে মিলানের কেন্দ্রস্থলে পুলিশ ও সেনার উপস্থিতি বাড়ানো হয়েছে। একটি নতুন অনলাইন আন্দোলন এই বিক্ষোভের আয়োজন করছে। তাদের অঙ্গীকার, “এই চোরেদের সরকারের পতন না হওয়া পর্যন্ত” প্রতি সপ্তাহান্তে তারা জমায়েত করবে। গত সপ্তাহান্তে যেসব দোকানে ভাঙচুর বা লুটপাট হয়েছিল, সেগুলির বাইরে মোতায়েন করা হয়েছে নিরাপত্তারক্ষী।

মিক্কিকের সতর্কবার্তা, ইতালির সব রাজনৈতিক শিবিরের নেতাদেরই তরুণদের এই ক্ষোভকে গুরুত্ব দিতে হবে। আগামী বছরের সাধারণ নির্বাচন যত এগিয়ে আসবে, প্রতিবাদ তত তীব্র হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তাঁর কথায়, “তরুণেরা কী অনুভব করছে, সে সম্পর্কে কোনও ধারণাই নেই। এক মিনিট সময় নিয়েও যদি ওরা শোনে, তা হলে বুঝবে, এই প্রজন্মের মাথায় কত ভাবনা রয়েছে। তারা শুধু চায়, কেউ তাদের কথা শুনুক।”